VSK প্রতিবেদন: আজ ২৪ ডিসেম্বর—ভারতীয় ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্মরণীয় দিন। আজ থেকে প্রায় ২৮৫ বছর আগে, ১৭৩৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর, মধ্য ভারতের ভোপাল প্রান্তরে এমন এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে পেশোয়া বাজিরাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠা বাহিনী একাই নিজাম, মোগল ও বিভিন্ন নবাবের যৌথ শক্তিকে পরাজিত করেছিল। এই যুদ্ধ ইতিহাসে মারাঠা শৌর্য ও কৌশলের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।
ভোপালের পটভূমি জড়িয়ে আছে পরমার বংশের রাজা ভোজের সঙ্গে। ইতিহাস অনুযায়ী, তিনিই এখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবসৃষ্ট জলাধার নির্মাণ করিয়েছিলেন। বহু বছর পর এই অঞ্চলে নিজাম শাসনের সূচনা হয়। নিজামের স্ত্রী ছিলেন রানি কমলাপতি, যার নামানুসারেই অঞ্চলটি পরিচিত হতে থাকে “রানি কমলাপতির ভোপাল” নামে। পরে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে দোস্ত মহম্মদ খান রানি কমলাপতির পুত্রকে হত্যা করে নিজেকে ভোপালের নবাব ঘোষণা করেন।
১৭৩৭ সালের প্রেক্ষাপটে মোগল সাম্রাজ্য চরম দুর্বলতার মধ্যে পড়ে। দিল্লিতে মারাঠাদের কাছে পরাজয়ের পর মোগল সম্রাট মহম্মদ শাহ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং মারাঠাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি রুখতে ভাগ্যনগর (বর্তমান হায়দরাবাদ)–এর নিজামের সাহায্য চান। এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয় আওধ ও বাংলার নবাবরাও।নিজাম ভোপাল দখলের লোভে প্রায় ৭০ হাজার সৈন্য নিয়ে দুর্গে শিবির গাড়েন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ। কিন্তু পেশোয়া বাজিরাও যুদ্ধক্ষেত্রে যে অসাধারণ কৌশলের পরিচয় দেন, তার সামনে এই বিশাল বাহিনীও অসহায় হয়ে পড়ে।
পেশোয়া বাজিরাও প্রথমেই তাঁর ভাই চিমাজিকে ১০ হাজার সৈন্যসহ আলাদা অভিযানে পাঠান। এরপর নিজাম বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে খাদ্য ও জল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, মারাঠারা জলসূত্র নিয়ন্ত্রণে এনে শত্রু সেনাকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। তৃষ্ণা ও দুর্বলতায় নিজাম বাহিনী যুদ্ধের ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে।অবশেষে সুযোগ বুঝে মারাঠা বাহিনী আক্রমণ চালায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৭০ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী ভেঙে পড়ে। পরাজয় নিশ্চিত দেখে নিজাম শুধু ভোপাল দখলের স্বপ্ন ত্যাগই করেননি, বরং নিজের ও মোগল সেনাপতি মহম্মদ খান বাহাদুরের প্রাণ রক্ষার জন্য মারাঠাদের ৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন।
এই যুদ্ধের কয়েক দিনের মধ্যেই, ১৭৩৮ সালের ৭ জানুয়ারি, ভোপালের দোরাহায় পেশোয়া বাজিরাও ও জয় সিং দ্বিতীয়ের মধ্যে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলস্বরূপ মালওয়া প্রদেশে মারাঠাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভোপালে স্বরাজ্যের ভিত্তি রচিত হয়।
এই যুদ্ধ স্মরণ করিয়ে দেয়—সংখ্যার জোর নয়, বুদ্ধি, সাহস ও কৌশলই ইতিহাস গড়ে তোলে, আর সেই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নায়ক ছিলেন পেশোয়া বাজিরাও।





